ই-টালি থেকে সরাসরি।
- Piyali Debnath

- Oct 11, 2024
- 3 min read
রবিবারের সকালবেলা, ফলে ইটালিয়ান সেলুনওলাদের ব্যস্ততা চরমে। এমনই ব্যস্ত একজনকে দেখে থমকে দাঁড়ালাম। দাঁড়ানোর কারণ পড়ন্ত আলোর সান্দ্র তরলে চোবানো সেই মুখের প্রচ্ছন্ন সুখ। থমকে দাঁড়ালাম কারণ কয়েকটা ইট মানুষকে এত সুখ দিতে পারে, এ যেন আমার বিশ্বাসের পরিধির বাইরে।
আজ্ঞে হ্যাঁ, ইটালিয়ান সেলুন দেখতে ইতালি যেতে হবে না। এই শহরের ফুটপাতের সৌন্দর্য দীর্ঘকাল ধরেই তাদের পাতা ইটের দখলে। ইটের ওপরে (ইট ছাড়াও মাটিতে নানা কিছু সিট হয়ে থাকে, আবার অনেক ইটালিয়ান তো চেয়ারে উঠছে) বসিয়ে চুল (মাথা, বগলের) ও দাড়ি কাটা হয় বলে এর নাম ইটালিয়ান সেলুন। কে বা কারা এ নাম দিয়েছে, জানা নেই। তবে, টকমিষ্টি ব্যঙ্গ খানিক মেশানো রয়েছে এই নামে।
না, কলকাতার ফুটে কত ইটালিয়ান আছে, তা গুনে ওঠা সম্ভব হয়নি। তবে, আমার মনে হয়, ওই আকাশ যেমন তারায় ভরা, তেমনই এই ইটালিয়ান সেলুন কলকাতার ফুটপাতগুলির সূর্য-তারা । অধিকাংশই বিহারের, কিছু ইউপি, কিছু ওড়িশা, কিছু এ রাজ্যের লোকজন সেই কবে, এ শহরে এসে হরেক ব্যবসার মতোই ফুটপাতের এককোণে প্রতিষ্ঠা করেছিল ইটালিয়ান ঈশ্বরকে, সেই থেকে তারা কলকাতার ফুটপাথ আলো করে বসে ।
তো, শুরুতে ছিলাম যেখানে, ব্যাস্ত সকালে ফিরি। গাল-ভরা সাবানে ব্লেড-ভরা রেজারের এক টান পড়েছে কি পড়েনি, কটকটে রোদের চোখরাঙ্গানি উপেক্ষা করে নামল বৃষ্টি। ফুটপাতে সেই বৃষ্টির নূপূর বেজে ওঠা মাত্র পাশে গুটিয়ে রাখা প্রকান্ড ছাতা খাটিয়ে বাকি দাড়িটা কাটার চেষ্টার শুরু করলেন খোচা খোচা পাকা দাড়ি শোভিত ভদ্রলোক। কিন্তু বৃষ্টি ততক্ষণে মুষল, ফলে হাফ-দাড়ি শেভের পরই কাপড় দিয়ে সাবান মুছিয়ে-টুছিয়ে কাস্টমারকে বিদায় বন্ধু জানাতেই হচ্ছে। কাস্টমার রণচণ্ডী হলেও, অবস্থা নাচার। তাই ইটালীয় মালমেটিরিয়াল জলদি গুছিয়ে প্রবীণ ক্ষুরকার কাছের শেডের নীচে গুটিসুটি। কাস্টমারটি ততক্ষণে ‘আগলা জনম মে তু শালা কুত্তা হোগা’ বলে বৃষ্টির ফাঁক গলে ভ্যানিস। আর কাকভেজা আমি ঠিক তার পাশেই ছাতুর দোকানের টাঙানো নীল রঙা প্লাস্টিকের নিচে দাঁড়িয়ে মাথা বাচাচ্ছি। পাশেই ছাতুর দোকান কারণ, এক বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময়ের সব দুপুরগুলিতে নাকি বেশ ভিড় হয় এই ভগবৎ শর্মার ইটালিয়ানে। অনেকেই অপেক্ষা করতে তাই ছাতুর দলা চিবোন। এসব গল্প খোদ শর্মাজির মুখ থেকে শুনছি, ঠিক তখনই আকাশে ভেসে এল কিউমুলোনিম্বাস মেঘের একটা বড় দলা। চারপাশে ঝুপ করে নামল অন্ধকারও। ‘বুঝাতা কি এইসন বারখা হোই, সব খতম হো যাই’, আকাশে চোখ বুলিয়ে স্বগতোক্তি শর্মাজির। ছাতার অভ্যেস বহুদিন হল নেই, কাজেই আমি, ইটালিয়ান শর্মা জি আর ছাতুওয়ালা পাড়েলাল আরও ঘন হয়ে বসলাম সেই প্লাস্টিকের ছাউনিকে মাথার ওপরে রেখে।
শর্মাজি আজ বছর পঁচিশ এখানে চুল-দাড়ি কাটছেন। বিহারের নওয়াদা জেলার বাসিন্দা। পোস্ট: বাহাদুরপুর। গ্রাম: করিগাঁও। পারিবারিক পেশা ক্ষৌরকর্ম হলেও চাকরির আশায় ‘কলকাত্তায়’ এসে হাজির হয়েছিলেন বছর ত্রিশেক আগে। হিসেব বলছে আমার তখনো এই ধরাধামে আবির্ভাব ই ঘটেনি। যাইহোক এ শহর তখন তাঁর কাছে আগমার্কা অচেনা, কিন্তু কয়েক জন ‘জানল-সুনল লোগ’ ছিল এখানে। তাঁদের একজনকে ধরে চাকরিও জোটালেন ডালহৌসিতে এক অফিসে। কিন্তু সেখানে তালা ঝুলল কয়েক বছর যেতে না যেতে। তখনও শরীরে তারুণ্যের বজ্র নির্ঘোষ, মন মায়াবী এবং মাথায় উপার্জনরর লক্ষ্য স্থির। একদিন ফুটপাতের এই এক চিলতে জায়গাও তাই মিলল। সেই থেকে চুল-দাড়ি বানিয়ে যাচ্ছেন এখানেই আবিরাম। জানালেন, চুল দাড়ি নিয়ে এইবাজারেও তার ৩০ টাকা রেট। চুল ১৫, দাড়ি ১৫। সানডে ছাড়া নো ডিজাইনের চুল কাটাকাটি। কেউ আবদার করলে অবশ্য অর্ধচন্দ্রটা করে দেন।
দুটো ছেলে। বড় ছেলেটার বয়স ১৮-১৯। পড়াশুনো করছে— এই ইটালিয়ান-অর্থে। পড়া শেষে চাকরি করতে চায় সে। ভগবতের গলায় এবার আত্মবিশ্বাস। এসব খুচরো কথার মাঝে হঠাৎই পাশ থেকে ছাতুওয়ালা পাড়েলাল বলে উঠলেন, অমিতজির স্টাইলে চুল কাটতে কিন্তু ভগবৎ ওস্তাদ। এ তল্লাটে ওর খুব নাম। অমিতজি মানে বুঝলেন তো অমিতাভ বচ্চন। ওকে তো সবাই ভগবৎ বচ্চন নামেই ডাকে।
আমি ভগবতের দিকে তাকাতেই এবার উনি লাজুক লাজুক মুখে কান এঁটো করে হাসতে থাকলেন ।
ভীষণ কৌতুহলে জিজ্ঞেস করে ফেললাম, কখনও ভাল একটা সেলুন করতে ইচ্ছে করে না ? যেখানে এসি থাকবে। গদি দেওয়া চেয়ার থাকবে। টিভি থাকবে।
না, না..
সেকী!... কেন?
এবার শর্মাজির এক মুখ আলো। জানেন কতজন আমার ফিকসড কাস্টমার? আমায় কত ভালবাসে জানেন? পুজোয় আমাকে নতুন জামা দেয়, আমার ছেলেকেও দেয়। বউয়ের জন্য শাড়ি আনে। আমার মনটা এসি ঘরের মত ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল হয়ে যায়। বড়লোকের সেলুনে এত ভালবাসা আছে নাকি? থাকতেই পারে না। আর একটা কথা, যেইসেন আছেন, তেইসন খুশি থাকতে জানতে হয়, বুঝলেন না!
মুখ তুলে দেখলাম আকাশে সূর্য দেব এবার শর্মাজির দিকেই তাকিয়ে যেন হাসছে, মেঘ কেটে গেছে। একদিন এসে অমিতজীর স্টাইলে চুল কাটা দেখবই শর্মাজিকে এই কথা দিয়ে আমি বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম একরাশ মন ভালো নিয়ে; আর সূর্যদেব কে মনে মনে বললাম, ‘ওদের রোদ- আলোয় ভরিয়ে রেখো ঠাকুর…’।





_edited.jpg)


Comments